মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

আদা ও মরিচের পোকা ও দমন

আদা ও মরিচের পোকা ও তার দমন ব্যবস্থাপনা
 

ড. মো. জুলফিকার হায়দার প্রধান*



আদা বাংলাদেশের একটি গুর্বত্বপূর্ণ মসলা জাতীয় ফসল। এটি পুষ্টিমানে সমৃদ্ধ এবং এর ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে। এতে লিপিড, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, মিনারেল, ভিটামিন, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস রয়েছে। গ্যাসট্রিক, ঠাণ্ডা ও কাশিসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে আদা ব্যবহার করা হয়। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী ২০০৫-০৬ সনে বাংলাদেশের প্রায় ১৪ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমিতে আদার চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন প্রায় ১.৭৩ লাখ মেট্রিক টন এবং হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১২.০৮ মেট্রিক টন। রাইজোম ফ্লাই আদার একটি প্রধান ৰতিকারক পোকা। এর আক্রমণে আদার ফলন ব্যাপকভাবে কমে যায়। নিলফামারী, রংপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন আদা উৎপাদনকারী এলাকায় ব্যাপকভাবে এর আক্রমণ লৰ করা গেছে। উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ পোকা দমন করে বাংলাদেশে আদার গড় ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। পোকাটির আক্রমণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।

পোকার বৈশিষ্ট্য
০ পূর্ণবয়স্ক পোকা সর্ব এবং লম্বা পা বিশিষ্ট। দেহ কালো, পাখা স্বচছ এবং ধূসর দাগযুক্ত। পাখা বিস্তৃত অবস্থায় এর আকার ১৩-১৫ মিমি.।
০ পূর্ণতাপ্রাপ্ত লার্ভা ক্রিমের মতো সাদা, পা বিহীন, প্রস্থে ৯.৫ মিমি. এবং প্রস্থে ১.৯৫ মিমি.।

ৰতির প্রকৃতি
০ ডিম থেকে বের হওয়ার পর সদ্যজাত লার্ভা রাইজোম ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে এবং রাইজোমের অভ্যন্তরীণ অংশ খায়।
০ আক্রান্ত গাছ হলুদ হয়ে যায়। পরবর্তীতে রাইজোমে পচন ধরে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে গাছ থেকে কোনো ফলন পাওয়া যায় না।
০ এ পোকা আদার রোগের সাথে সম্পর্কিত। এ পোকা ডিম পাড়া এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য ছত্রাক আক্রান্ত আদা গাছ পছন্দ করে। রোগাক্রান্ত রাইজোমের মধ্যে পোকার লার্ভা এবং পিউপা দেখা যায়। এ ছাড়াও পূর্ণ বয়স্ক পোকাগুলো আদা গাছে ব্যাকটেরিয়াল উইল্টের বাহক হিসেবে কাজ করে।

জীবনচক্র
পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা গাছের গোড়ায় মাটির ছোট ঢেলার নিচে, মাটির ফাটলে অথবা মাটিতে একটি একটি করে অথবা গুচ্ছাকারে (প্রতি গুচ্ছে ৬ থেকে ১০টি) ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ছোট, সাদা এবং উভয় প্রান্তে সর্ব।
০ ২ থেকে ৫ দিন পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লার্ভাগুলো ১৩ থেকে ১৮ দিন খাওয়ার পর রাইজোমের মধ্যেই পিউপাতে পরিণত হয়। পিউপা ১০ থেকে ১৫ দিন পর পূর্ণবয়স্ক পোকায় পরিণত হয়।
০ এর জীবণচক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ৪ সপ্তাহ সময় লাগে।

দমন ব্যবস্থাপনা

স্বাস্থ্যবান এবং রোগমুক্ত রাইজোম বীজের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
০ ফসল সংগ্রহের সময় লার্ভা ও পিউপাসহ পচা রাইজোম সংগ্রহ এবং ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
০ গাছের গোড়ার মাটি নিয়মিত উলট-পালট করতে হবে কারণ পোকা মাটিতে ডিম পাড়ে।
০ যেহেতু রোগাক্রান্ত রাইজোমে পোকার আক্রমণ হয় এ জন্য ফসলকে রোগমুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
০ অত্যধিক আক্রান্ত এলাকায় আক্রমণের শুর্বতে নিম্নলিখিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে-
 কার্বোসালফান (মার্শাল ২০ ইসি, সানসালফান ২০ ইসি, জেনারেল ২০ ইসি বা অন্য নামের) অথবা ফেনিট্রোথিয়ন (ফেনিটকস ৫০ ইসি, সুমিথিয়ন ৫০ ইসি, ইমিথিয়ন ৫০ ইসি, সোভাথিয়ন ৫০ ইসি বা অন্য নামের) প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হিসেবে।

মরিচ
মরিচ বাংলাদেশের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় গুর্বত্বপূর্ণ মসলাজাতীয় ফসল। এতে প্রচু পরিমাণে ভিটামিন এবং ফসফরাস রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ১.৫০ লাখ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয় এবং মরিচের গড় উৎপাদন প্রায় ১.৩৮ টন/হেক্টর। মরিচ গাছ বিভিন্ন প্রকার পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে মাইট একটি অত্যন্ত ৰতিকর পেস্ট। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হারে মাইটের আক্রমণ লৰ করা যাচ্ছে। এ পোকা গাছ থেকে রস শোষণ করে মরিচের মোট উৎপাদন এবং গুণগত মান কমিয়ে দেয়। নিম্নে মাইটের আক্রমণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

মাইটের বৈশিষ্ট্য
০ মাইট অত্যন্ত ছোট, সাধারণত হাত লেন্সের সাহায্য ব্যতীত দেখা যায় না। এ পোকা উপবৃত্তাকার, উজ্জ্বল, হলদে সবুজ বর্ণের তবে মৃত মাইটগুলো হলদে বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে। স্ত্রী মাইটের পেছনের অংশে লম্বালম্বি হালকা সাদা দাগ দেখা যায়। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মাইট লম্বয় প্রায় ০.২ মিমি. এবং পুর্বষ প্রায় ০.১১ মিমি.।
০ এর চার জোড়া সাদাটে পা আছে। পুর্বষ মাইটের চতুর্থ জোড়া পা বর্ধিত এবং স্ত্রীর ৰেত্রে এটি খুবই ছোট আকৃতির।
০ লার্ভা তিন জোড়া পা বিশিষ্ট, প্রায় ০.১ মিমি. থেকে ০.২ মিমি. লম্বা ডিম থেকে বের হওয়ার পর লার্ভাগুলো বেশ লম্ব দেখায়, পরে স্ত্রী লার্ভা হলদে সবুজ বা ঘন সবুজ বর্ণের এবং পুর্বষ লার্ভাগুলো হলদে বাদামি বর্ণ ধারণ করে। লার্ভাগুলো খুব আস্তে আস্তে চলাচল করে, খুব একটা দূরে যায় না।

ৰতির প্রকৃতি
০ লার্ভা এবং পূর্ণবয়স্ক মাইট গাছের কোষ ছিদ্র করে রস শোষণ করে এবং বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত করে। গাছে খাদ্য তৈরি এবং পানি ¯স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হয়। পাতা সর্ব, ফ্যাকাশে, মোচড়ানো এবং নিচের দিকে বাঁকানো হয়। পাতা চামড়ার মতো হয়ে যায় এবং শিরাগুলো মোটা হয়। পাতা এবং কচি কাণ্ড লালচে বর্ণের হয়। ফুলের কুঁড়ি বাঁকানো এবং মোচড়ানো হয়।
০ গাছের বৃদ্ধি বিঘ্নিত হয়,  কচি গাছের আকার ছোট হয় এবং বয়স্ক গাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ফুল ঝরে পড়ে।
০ ফল বিকৃত, ৰত বিশিষ্ট, অপরিপক্ব এবং অসম আকৃতির হয়। ফলের উৎপাদন এবং বাজার মূল্য কমে যায়।
০ সাধারণত নতুন পাতা এবং ছোট ফলে মাইট বেশি দেখা যায় কারণ এ পোকা শক্ত টিস্যু খেতে পারে না। লার্ভা এবং পূর্ণ বয়স্ক মাইটগুলো পাতার  নিচের দিক খেতে বেশি পছন্দ করে।
০ এ পোকা মরিচ ছাড়াও তুলা, বেগুন, পেয়ারা, লেবুজাতীয় ফসল, পাট, পেঁপে, আলু, টমেটো, আম, বরবটি, তিল, আঙুরসহ বিভিন্ন ফসল এবং বিভিন্ন শোভা বর্ধনকারী গাছেও আক্রমণ করে থাকে।

জীবনচক্র
০ এ পোকার জীবনচক্রের চারটি ধাপ-ডিম, লার্ভা, পিউপা (নিম্ফে) এবং পূর্ণবয়স্ক। মাত্র ৪-৬ দিনে এ পোকা ডিম থেকে পূর্ণ বয়স্ক মাইটে পরিণত হয়।
০ পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মাইট নতুন বৃদ্ধি প্রাপ্ত পাতার নিচে একটি একটি করে (প্রতি দিনে ২-৫টি) প্রায় ২০-৫০টি ডিম পাড়ে। এভাবে ৮-১৩ দিন  ডিম দেয়ার পর এ পোকা মারা যায়। ডিমগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র, প্রায় ০.৭ মিমি. লম্বা ২-৩ দিন পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এরা যৌন মিলন ছাড়াও ডিম দেয় তবে সে ডিম থেকে শুধু পুর্বষ বাচ্চা হয়।
০ লার্ভাগুলো ২-৩ দিন খাওয়ার পর পিউপায় পরিণত হয়। পিউপাগুলো স্থির অবস্থায় থাকে। কোনো খাদ্য গ্রহণ করে না। এ ধাপে এর চার জোড়া পা থাকে। ২-৩ দিন পর পোকা পূর্ণবয়স্ক মাইটে পরিণত হয়।
০ স্থির স্ত্রী পিউপগুলো পুর্বষ মাইটের  কাছে খুবই আকর্ষণীয়। এ পোকা স্ত্রী পিউপা (নিম্ফ) কে বহন করে নতুন পাতায় নিয়ে যায়। ধারণা করা হয় পুর্বষ মাইট স্ত্রী মাইটকে মিলন পূর্ববর্তী পাহারা প্রদান করে। যখন পিউপা ধাপ থেকে পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকায় পরিণত হয় তখনই পুর্বষটি এর  সাথে মিলিত হয়।
০ এ পোকা সাদা মাছি, থ্রিপস এবং জাব পোকার দ্বারা বিভিন্ন এলাকায় এবং পোষক গাছে বিস্তার লাভ করে। পুর্বষ মাইটগুলো প্রায় ৫-৯ দিন বাঁচে। ছায়া এবং উচ্চ আর্দ্রতাবিশিষ্ট আবহাওয়া মাইটের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।


দমন ব্যবস্থাপনা
০ মরিচ উৎপাদনের জন্য ছায়ামুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।
০ ফল সংগ্রহের সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে সংগ্রহকারীর কাপড় এবং শরীর দ্বারা মাইটগুলো আক্রান্ত গাছ থেকে অনাক্রান্ত গাছ বা ৰেতের মধ্যে ছড়াতে না পারে।
০ বিভিন্ন অপোষক ফসলের সাথে আন্তঃফসল করতে হবে এবং এর শস্য পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
০ সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে এর আক্রমণ কমানো সম্ভব।
০ ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি সেপ্র করতে হবে। এর মধ্যে ১-২% তেল ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
০ আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে নিম্নলিখিত মাকড়নাশক প্রয়োগ করতে হবে-


সালফার (কুমুলাস ডিএফ বা রনোভিট ৮০ ডবিৱউ জি বা থিওভিট ৮০ ডবিৱউ জি বা সালফোলাক ৮০ ডবিৱউ জি, ম্যাকসালফার ৮০ ডবিৱউ জি বা সালফেটক্স ৮০ ডবিৱউ জি) প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম অথবা প্রোপারগাইট (সুমাইট ৫.৭ ইসি) বা ব্রোমাপ্রোফাইলেট (নিউরোন ৫০০ ইসি) বা ডাইকোফল (ডাইকোফল ১৮.৫ ইসি) বা ইথিওন (ইথিওন ৪৬.৫ ইসি বা সিথিওন ৪৬.৫ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি. হিসেবে।
  মাইটগুলো সাধারণত পাতার নিচের দিকে থাকে, এ জন্য সেপ্র করার সময় লৰ রাখতে হবে যেন পাতার নিচের অংশ সম্পূর্ণভাবে ভিজে যায়।

 


Share with :

Facebook Twitter